১১ বছরের প্রযুক্তি উন্নয়ন ও গবেষণার পর উড়ন্ত গাড়ি তৈরির প্রতিযোগিতায় নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে টেসলাকে স্বাগত জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আলেফ অ্যারোনটিকস। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তাদের বৈদ্যুতিক উড়ন্ত গাড়িকে টেসলা রোডস্টার ও সাইবারট্রাকের ওপর দিয়ে উড়ে যেতে দেখা গেছে।
আলজাজিরার ভিডিও প্রতিবেদনে বলা হয়, ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান টেসলা নতুন রোডস্টার গাড়ির আকাশে ওড়ার সক্ষমতা প্রদর্শনের পর পাল্টা চমক দেখিয়েছে আলেফ অ্যারোনটিকস। ভিডিওটি প্রকাশের মাধ্যমে টেসলাকে উড়ন্ত গাড়ি তৈরির প্রতিযোগিতায় স্বাগত জানানোর পাশাপাশি রসিকতার ছলে প্রতিষ্ঠানটিকে খোঁচাও দিয়েছে আলেফ। তাদের বক্তব্য, এ প্রযুক্তি নিয়ে তারা গত ১১ বছর ধরে কাজ করছে এবং এত দিন এ দৌড়ে প্রায় একাই ছিল।
১৭ অক্টোবর আলজাজিরার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, আলেফের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জিম দুখোভনি জানিয়েছেন, উড়ন্ত গাড়ি তৈরির প্রতিযোগিতায় টেসলাকে স্বাগত জানাতে পেরে তাঁরা আনন্দিত। বড় একটি প্রতিষ্ঠানের এ খাতে অংশগ্রহণ ইতিবাচক বলেও মনে করেন তিনি।
আলেফের দাবি, ভিডিওটি কেবল প্রচারণামূলক প্রদর্শনী নয়; এর মাধ্যমে তাদের উড়ন্ত গাড়ির এক হাজারতম পরীক্ষামূলক উড্ডয়নও চিহ্নিত হয়েছে। এর আগে প্রতিষ্ঠানটির একটি গাড়িকে টেসলা সাইবারট্রাকের ওপর দিয়ে উড়তে দেখা গিয়েছিল।
আলেফ ও টেসলার প্রযুক্তিতে পার্থক্য
আলেফের তৈরি গাড়িটি সড়কে চলার পাশাপাশি উল্লম্বভাবে উড্ডয়ন ও আকাশে চলাচলের জন্য নকশা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, গাড়িটির শরীর এমনভাবে তৈরি, যাতে উড্ডয়নের সময় তা ডানার মতো কাজ করে। এর বৈদ্যুতিক প্রপালশন ব্যবস্থা একাধিক মোটরের সাহায্যে গাড়িটিকে ওপরে তুলতে পারে।
অন্যদিকে, টেসলার নতুন প্রজন্মের রোডস্টারে বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে গাড়িটিকে অল্প সময়ের জন্য বাতাসে তোলা ও আকাশে কসরত করার সক্ষমতা প্রদর্শন করা হয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, এতে ঠান্ডা গ্যাসের থ্রাস্টার ও বিশেষ সাকশন ব্যবস্থা ব্যবহারের কথা জানিয়েছে টেসলা। তবে গাড়িটির সড়কে চলাচলের অনুমোদন, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক জানিয়েছেন, নতুন রোডস্টারের উৎপাদন ২০২৮ সালের আগে শুরু হওয়ার কথা নয়।
অর্থাৎ, দুই প্রতিষ্ঠানই গাড়ি ও উড্ডয়ন প্রযুক্তিকে একসঙ্গে আনার চেষ্টা করছে। তবে আলেফের লক্ষ্য সড়কে চলতে সক্ষম একটি পূর্ণাঙ্গ উড়ন্ত গাড়ি তৈরি করা। অন্যদিকে, টেসলার সাম্প্রতিক প্রদর্শনীতে মূলত রোডস্টারের বিশেষ উড্ডয়ন ও কসরতের সক্ষমতা তুলে ধরা হয়েছে।
আলেফের উড়ন্ত গাড়ি তৈরির ইতিহাস
আলেফ অ্যারোনটিকসের যাত্রা শুরু ২০১৫ সালে। প্রতিষ্ঠানটির চার প্রতিষ্ঠাতা হলেন জিম দুখোভনি, কনস্টান্টিন কিসলি, পাভেল মারকিন ও ওলেগ পেত্রভ। তাঁদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি যান তৈরি করা, যা সাধারণ গাড়ির মতো রাস্তায় চলতে ও পার্ক করতে পারবে, আবার প্রয়োজন হলে উল্লম্বভাবে উড়তেও সক্ষম হবে।
প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ছোট আকারের প্রোটোটাইপ তৈরি করা হয়। ২০১৮ সালে পূর্ণ আকারের কাঠামোর পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন হয় এবং ২০১৯ সালে পূর্ণ আকারের প্রোটোটাইপ আকাশে ওড়ানো হয়। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আলেফ’ নামে পরিচিতি পায়।
আলেফের পরিকল্পিত মডেল এ গাড়িতে সড়ক ও আকাশ—দুই ধরনের চলাচলের সুবিধা রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে পরীক্ষামূলক প্রদর্শনী সফল হওয়া আর সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য গাড়ি পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়া এক বিষয় নয়। নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন, উৎপাদন ব্যয় এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে নির্ভরযোগ্যতা—এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই প্রযুক্তিটিকে বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে হবে।
আলেফের সিইওর মতে, টেসলার মতো বড় প্রতিষ্ঠানের এ খাতে আগ্রহ উড়ন্ত গাড়ি প্রযুক্তির প্রতি বিনিয়োগকারী ও সাধারণ মানুষের মনোযোগ বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তুলনা এবং এ ধরনের যানবাহনের জন্য প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন তৈরির উদ্যোগও গতি পেতে পারে।
তবে উড়ন্ত গাড়ি নিয়ে আগ্রহ বাড়লেও দৈনন্দিন যাতায়াতের বাহন হিসেবে এগুলো ব্যবহারের আগে বেশ কিছু বাধা অতিক্রম করতে হবে। আকাশপথের নিরাপত্তা, সড়ক ও আকাশযান চলাচলের নিয়মের সমন্বয়, চালকের প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে দাম রাখা—সবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আলেফের গাড়ির সম্ভাব্য দাম নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রায় ২ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৯ ডলারের কথা বলা হয়েছে। ফলে প্রযুক্তিটি বাজারে এলেও শুরুতে তা অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে থাকতে পারে।